প্রায় দেড় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের কর্ণধার সালমান এফ রহমান। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টার পদে থাকা এ ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন কোম্পানির সংখ্যা ২০০টির বেশি। এসব কোম্পানির নামে দেশের কয়েক ডজন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া হয়েছে ৮০ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ। নামে-বেনামে থাকা এসব কোম্পানির বেশির ভাগ এখন বন্ধ। খেলাপি হয়ে গেছে কোম্পানিগুলোর নামে থাকা ব্যাংক ঋণও। কর্মহীন হয়েছেন এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত কর্মীরা। কিন্তু এ রকম শত কোম্পানির ভিড়ে একমাত্র ব্যতিক্রম বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। সালমান এফ রহমানের পতন ও অনুপস্থিতি সত্ত্বেও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিটির আয় ও মুনাফা দুটোই বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় তথা ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়কালে ওষুধ বিক্রি বা ব্যবসা থেকে কোম্পানিটির আয় ছিল ২ হাজার ২০৬ কোটি টাকা। আর ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তথা ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদে এ আয় বেড়ে ২ হাজার ৪০১ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। ২০২৩ সালের শেষ ছয় মাসে কোম্পানিটির মোট মুনাফা (গ্রস প্রফিট) ছিল ৯৭৯ কোটি টাকা। আর ২০২৪ সালের একই সময়ে এ মুনাফা বেড়ে ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকায় ঠেকে। বিক্রি ও গ্রস মুনাফা বাড়ার প্রভাবে ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে বেক্সিমকো ফার্মার নিট মুনাফাও বেড়েছে। আগের বছরের একই সময়ে কোম্পনিটি ৩০০ কোটি টাকা নিট মুনাফা করলেও গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী ছয় মাসে এ মুনাফা বেড়ে ৩৫৩ কোটি টাকা হয়েছে।
সালমান এফ রহমান কারাগারে যাওয়ার পর বেক্সিমকো ফার্মার সংরক্ষিত আয়ও (রিটেইন আর্নিংস) ৩ হাজার ২২৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩ হাজার ৬৮০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিপরীতে কমেছে ওষুধ কোম্পানিটির ব্যাংক ঋণের স্থিতি। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে বেক্সিমকো ফার্মার ঋণ স্থিতি ছিল ৭৬০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে এ ঋণ স্থিতি ৬১৯ কোটি টাকায় নেমে আসে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে আর কোনো আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। এ বিষয়ে কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত বছরের শুরুতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে ৯ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দিয়েছিল। তবে কোম্পানিটি বিএসইসির এ সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে। বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন থাকায় বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পর্ষদ সভা করতে পারছে না। এ কারণে কোম্পানিটি ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন, একই হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এবং চলতি ২০২৫-২৬ হিসাব বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন এখনো অনুমোদন ও প্রকাশ করতে পারেনি। ২০২৪-২৫ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না করার কারণে গত ২ জানুয়ারি থেকে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের লেনদেন সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে।
তবে কোম্পানিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন আগের তুলনায় কোম্পানির সংরক্ষিত আয় বাড়ার বিপরীতে ব্যাংক ঋণ কমেছে। পাশাপাশি এ সময় ব্যবসায়িকভাবেও কোম্পানির পারফরম্যান্স ভালো ছিল।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মোহাম্মদ আলী নেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের পুঁজিবাজারের পাশাপাশি বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জেও তালিকাভুক্ত। এ কারণে কোম্পানিকে কঠোর সুশাসন মেনে চলতে হয়। ফলে কোম্পানির দৈনন্দিন কার্যক্রমে পর্ষদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই। কোম্পানি পরিচালনায় পেশাদার কর্মীরাই মুখ্য ভূমিকা রাখছেন। আমাদের ব্যবসাও স্বাভাবিক গতিতে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের সহায়তা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।’
দেশের ওষুধ খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৬ সালে। সে সময় তারা জার্মানির বায়াহ ও যুক্তরাষ্ট্রের আপজন কোম্পানির কাছ থেকে ওষুধ আমদানি করে দেশের বাজারে বিক্রি করত। পরবর্তী সময়ে ১৯৮০ সালে বাংলাদেশেই লাইসেন্সিং চুক্তির আওতায় ওষুধ উৎপাদন শুরু করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস। বর্তমানে কোম্পানিটির পোর্টফোলিওতে তিনশর বেশি পণ্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের ৬০টিও বেশি দেশে ওষুধ রফতানি করছে কোম্পানিটি।
সালমান এফ রহমান অনুপস্থিত থাকলেও ২০২৫ সালে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস তাদের গবেষণা ও উৎপাদন সক্ষমতার বড় অগ্রগতি হিসেবে একটি বিরল রোগের উচ্চমূল্যের ওষুধের জেনেরিক সংস্করণ বাজারে আনার ঘোষণা দেয়। কোম্পানিটি ‘ট্রিকো’ নামের জেনেরিক ওষুধের উৎপাদন ও সরবরাহ পরিকল্পনা প্রকাশ করে। এ ওষুধ সিস্টিক ফাইব্রোসিস নাম পরিচিত জটিল জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। বেক্সিমকো ফার্মার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ট্রিকো মূলত উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের রোগীদের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা নিশ্চিতের লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। যদিও ওষুধটির পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক সরবরাহ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তবে ২০২৫ সালেই এর উৎপাদন প্রস্তুতি, নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছর কোম্পানিটি হৃদরোগ ও গ্যাস্ট্রিকের চিকিৎসায় ব্যবহৃত নতুন ওষুধ বাজারে ছেড়েছে। তাছাড়া গত বছর বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ওষুধ খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে সিলভার ক্যাটাগরিতে আইসিএমএবি বেস্ট করপোরেট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে যেমন দক্ষ পরিচালন ও সুশাসন দেখা যায় তা সালমান এফ রহমানের অন্য সব কোম্পানিতে অনুপস্থিত।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস ১৯৮৬ সালে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। পাশাপাশি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) কোম্পানিটি তালিকাভুক্ত। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের বিনিয়োগকারীদের কাছে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের ২২ দশমিক ৪২ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। আর বাংলাদেশের স্টক এক্সচেঞ্জে রয়েছে ৭৭ দশমিক ৫৮ শতাংশ শেয়ার।
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের অন্যতম উদ্যোক্তা সালমান এফ রহমান ও তার ভাই এএসএফ রহমান। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর মধ্যে কেবল বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসে করপোরেট সুশাসন অটুট ছিল। ব্যবসা সম্প্রসারণ, আয়-ব্যয়ের হিসাবায়ন ও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে রীতিনীতি মেনে চলেছে কোম্পানিটি। বিদেশী স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার কারণে সালমান এফ রহমান এ কোম্পানিটির পর্ষদ কিংবা পরিচালনায় অনৈতিক হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকতেন। এ কারণে তিনি কারাগারে যাওয়ার পরও বেক্সিমকো ফার্মার ব্যবসায় কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি। উল্টো ওষুধ শিল্পের বাজারে কোম্পানিটির অবস্থান আরো সুসংহত হয়েছে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি আমাদের দেশেও একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল ভিত্তি হলো করপোরেট গভর্ন্যান্স। এখানে গভর্ন্যান্স বলতে মূলত নিয়মকানুনের যথাযথ পরিপালন বা কমপ্লায়েন্সকে বোঝায়, যা অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক—উভয় ধরনের হয়ে থাকে। এক্সটারনাল কমপ্লায়েন্স হলো একটি দেশের প্রচলিত ব্যবসায়িক নিয়ম ও নীতিমালা যথাযথভাবে মেনে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বা ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স হলো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়মনীতি, যা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যেমন ব্যবসার নীতি, মুনাফাসংক্রান্ত নীতিমালা, মানবসম্পদ নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ ও নিরীক্ষাসংক্রান্ত নিয়মাবলি নির্ধারণ করা। প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃনিরীক্ষা—উভয় ধরনের নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হয়।’
দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রতিষ্ঠান হতে হলে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ে বা টপ ম্যানেজমেন্টে যোগ্য ও দক্ষ লোক থাকতে হবে এবং তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বিভাগ, অ্যাডভাইজরি বোর্ড বা ট্রাস্টি বোর্ডকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে ওই প্রতিষ্ঠান খুব ভালোভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা। এতে প্রতিষ্ঠানের কর্মদক্ষতা বা এফিশিয়েন্সি বৃদ্ধি পায়। তুলনামূলক কম উন্নত দেশেও যদি কোনো কোম্পানি সঠিকভাবে করপোরেট গভর্ন্যান্স অনুসরণ করে, তবে সেই কোম্পানিটি অন্যদের চেয়ে আলাদা বা স্ট্যান্ড আউট করবে এবং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থেকে ভালো ফলাফল করতে সক্ষম হবে।’
বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের তিনটি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। এগুলো হলো বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড, বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি (বেক্সিমকো) লিমিটেড ও শাইনপুকুর সিরামিকস লিমিটেড। এর মধ্যে ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্সের দিক দিয়ে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বাকি দুই কোম্পানির চেয়ে বেশ এগিয়ে। মূলত সুশাসন চর্চা ও পেশাদার কর্মীদের মাধ্যমে কোম্পানি পরিচালনার ফলেই বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতেও ভালোভাবে টিকে আছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও টিকে থাকায় সবচেয়ে জরুরি ভূমিকা রাখে কোনো প্রতিষ্ঠানের করপোরেট গভর্ন্যান্স—এমনটা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ড. জাকির হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যদিও বিক্রির দিক থেকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম কোম্পানি, কিন্তু করপোরেট গভর্ন্যান্সের দিক থেকে তারা এক নম্বর। দ্বিতীয়ত ফার্মা সেক্টরে মানবসম্পদ বা জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রয়েছে বেক্সিমকোর। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি মালিকরা নিজেরা চালান না, বরং প্রফেশনাল বা পেশাদার লোক দ্বারা পরিচালিত হয়। বেক্সিমকোর শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের অবর্তমানেও প্রতিষ্ঠানটি চালাতে কোনো সমস্যা হয়নি। কারণ তাদের অভ্যন্তরীণ কাঠামো বা ‘ঘরের ভেতরে’ অভিজ্ঞ পেশাদার ব্যক্তিরা আগে থেকেই প্রস্তুত থাকেন, যারা বিভিন্ন শাখা বা উইং সামলাতে পারেন। দেশের ফার্মা সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরির ক্ষেত্রে বেক্সিমকো অগ্রগণ্য।’
বর্তমানে বাজারে অন্য ওষুধ কোম্পানিতে যারা বড় পদে কাজ করছেন, তাদের একটি বড় অংশই ‘বেক্সিমকো প্রোডাক্ট’ বা বেক্সিমকো থেকে তৈরি হওয়া কর্মী উল্লেখ করে জাকির হোসেন আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি যেমন বেক্সিমকো, এসিআই ও এসকেএফ মূলত পেশাদারদের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মালিকদের দ্বারা পরিচালিত। বাংলাদেশে সাকসেশন প্ল্যানিং সাধারণত ভালো হয় না, তবে এক্ষেত্রে বেক্সিমকো একটি ইতিবাচক উদাহরণ হিসেবে কাজ করছে। সমস্যা থাকলেও তাদের এ ব্যবস্থার কারণে তারা প্রতিকূল সময়েও টিকে থাকতে পারছে। আমি মনে করি, পেশাদারদের ওপর নির্ভরতা এবং মালিকপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপহীন ব্যবস্থাপনার কারণেই বেক্সিমকো স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছে।’
শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির কয়েকদিন পরেই ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রাজধানীর সদরঘাট এলাকা থেকে সালমান এফ রহমান গ্রেফতার হন। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন। এরই মধ্যে ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের সময় হত্যাকাণ্ডসহ বহু মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেও তার বিচার চলছে। আবার গত দেড় বছরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষ থেকে দায়েরকৃত অনেক মামলায়ও সালমান এফ রহমানকে আসামি করা হয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে লুটপাট হওয়া অর্থের চিত্র সামনে আসতে থাকে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইকোর্টে জমা দেয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের অন্তত ১৬টি ব্যাংক ও সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলো ৫০ হাজার ৯৮ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে কেবল রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকেই নেয়া হয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। ওই বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যেই সালমান এফ রহমানের নেয়া ৩১ হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপির খাতায় ওঠে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনিরুজ্জামানের মাধ্যমে প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনের বিষয়ে ওই সময় আইনজীবী ব্যারিস্টার মুনিরুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘বেক্সিমকো গ্রুপের মোট ১৮৮টি কোম্পানি জনতা, সোনালী, অগ্রণী, রূপালী, আইএফআইসি, ন্যাশনাল, এবি ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। বেশির ভাগ ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক আইন, নিয়ম, রীতিনীতি ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালা লঙ্ঘন করা হয়েছিল।’
হাইকোর্টে ওই প্রতিবেদন দাখিলের পর ২০২৫ সালে দেশের প্রায় এক ডজন ব্যাংকে ফরেনসিক অডিট করা হয়। এর মধ্যে সালমান এফ রহমান চেয়ারম্যান পদে থাকা আইএফআইসি ব্যাংকও রয়েছে। ফরেনসিক অডিট ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ নিরীক্ষায় দেশের বিভিন্ন ব্যাংকে সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেনামি বিভিন্ন কোম্পানির নামে আরো অন্তত ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণের সন্ধান পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে কেবল আইএফআইসি ব্যাংকেই ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি বেনামি ঋণ পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে জানান, নামে-বেনামে সালমান এফ রহমানের ২০০-এর বেশি কোম্পানি রয়েছে। এসব কোম্পানির নামে ব্যাংক ও আর্থিক খাত থেকে বের করে নেয়া ঋণের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কেবল বেক্সিমকো ফার্মা ছাড়া বাকি কোনো কোম্পানির ঋণই এখন আর নিয়মিত নেই।
সূত্র: বণিক বার্তা

