Sunday, September 20, 2026

সর্বশেষ

বিনোদন নয় সচেতনতা: টিকটক-রিলসে চরের মানুষের বন্ধু সাংবাদিক কাজল

সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিনজুড়ে যখন শুধুই সস্তা বিনোদন আর ট্রেন্ডের ছড়াছড়ি, ঠিক তখনই ফেসবুক রিলস কিংবা টিকটকের ৩০ সেকেন্ড থেকে ১ মিনিটের একেকটি ভিডিও বদলে দিচ্ছে একটি অঞ্চলের মানুষের জীবন! কোনো চাকচিক্যময় স্টুডিও নয়, কাঁধে গামছা আর হাতে একটা স্মার্টফোন নিয়েই প্রতিনিয়ত চরের প্রান্তিক মানুষের সুখ-দুঃখের জীবন্ত দলিল হয়ে উঠছেন একজন সাংবাদিক। তিনি আবদুস সবুর মোল্লা, তবে নেটদুনিয়ায় এবং ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘গামছা কাজল’ নামে।

পদ্মা নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা চরাঞ্চলের মানুষের জীবন আর জীবিকাকে ক্যামেরার ফ্রেমে বন্দি করে গ্রামীণ সাংবাদিকতায় এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছেন এই সংবাদকর্মী। ফেসবুক এবং টিকটকে গামছা কাজলের আইডিগুলোতে ঢুকলেই দেখা যায় এক অন্যরকম বাংলাদেশের চিত্র। চরের কৃষকদের তপ্ত রোদে ফসল বোনার কষ্ট, নদীতে জেলেদের জাল ফেলার রোমাঞ্চ, কিংবা নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারানো মানুষের আকুল আর্তনাদ—সবকিছুই নিখুঁতভাবে উঠে আসে তাঁর ছোট ছোট রিলস ও টিকটক ভিডিওতে।

বর্তমানে কাজলের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ফলোয়ার সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার এবং টিকটক অ্যাকাউন্টে ফলোয়ারের সংখ্যা ৬ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। চরের মানুষের জীবনসংগ্রাম নিয়ে তৈরি তাঁর ছোট ছোট রিলস ভিডিওগুলোর ভিউ ও কমেন্ট সেকশন দেখলেই বোঝা যায়, কতটা গভীর মমতায় তিনি এই জনপদকে তুলে ধরছেন। মূলধারার বড় বড় গণমাধ্যম যেখানে চরের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রতিদিন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে কাজলের এই লাখো ফলোয়ারের প্ল্যাটফর্মটিই এখন চরবাসীর প্রধান কণ্ঠস্বর।

গামছা কাজলের তৈরি কনটেন্টগুলো শুধু মানুষের দেখার আনন্দ দিচ্ছে না, বরং স্থানীয় গ্রামীণ জনগণের জীবনমান উন্নয়ন ও সচেতনতায় রাখছে এক অভাবনীয় ভূমিকা:

সাপের আতঙ্ক দূর ও জীবন রক্ষা: চরভদ্রাসনের চরাঞ্চলগুলোতে বিষধর রাসেলস ভাইপারসহ বিভিন্ন সাপের উপদ্রব এক বড় আতঙ্ক। গামছা কাজল তাঁর ছোট ছোট টিকটক ও রিলস ভিডিওর মাধ্যমে সাপ নিয়ে ছড়ানো গুজব দূর করছেন। সাপ দেখলে কী করতে হবে, কামড়ালে ওঝার কাছে না গিয়ে কেন দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে এবং মাঠে কাজ করার সময় কেন গামবুট জুতো পরা উচিত—এই বার্তাগুলো তিনি তাঁর ভিডিওতে তুলে ধরছেন। তাঁর এই সচেতনতামূলক ভিডিওর কারণে চরের সাধারণ কৃষকদের মাঝে সচেতনতা বেড়েছে এবং অনেকেই এখন সাপের হাত থেকে বাঁচার উপায়গুলো মেনে চলছেন।

প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ ও নাগরিক অধিকার: চরের মানুষের যাতায়াত কষ্ট, ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষের দুর্দশা কিংবা স্বাস্থ্যসেবার অভাব নিয়ে তৈরি তাঁর রিলস ভিডিওগুলো দ্রুত ভাইরাল হওয়ায় তা খুব সহজেই প্রশাসনের নজরে আসে। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান মিলছে, যা চরের মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়াতে সাহায্য করছে।

হারিয়ে যাওয়া লোকসংস্কৃতির পুনর্জাগরণ: গ্রামীণ মেলা, শত বছরের পুরোনো ‘অরান গান’ কিংবা চরাঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার মুখ থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন তিনি। টিকটকের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্যগুলোকে তুলে ধরে তিনি স্থানীয় সংস্কৃতি রক্ষায় কাজ করছেন।

কাধে কেন সবসময় গামছা রাখেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মৃদু হেসে গামছা কাজল জানান, “গামছা হলো আমাদের চরের খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের প্রতীক। আমি তাঁদেরই একজন। ফেসবুক রিলস আর টিকটককে মানুষ শুধু নাচের বা বিনোদনের মাধ্যম ভাবত। আমি চেয়েছি এই আধুনিক প্রযুক্তিকে চরের মানুষের উপকারে লাগাতে। একটা রিলস ভিডিও যখন একজন কৃষকের জীবন বাঁচানোর বার্তা দেয়, তখনই আমার সাংবাদিকতা সার্থক হয়।”

ডিজিটাল যুগে এসে সোশ্যাল মিডিয়াকে কীভাবে গ্রামীণ মানুষের ভাগ্যবদল, সচেতনতা এবং কল্যায়ণে ব্যবহার করা যায়—তার এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ফরিদপুরের গামছা কাজল। চরের মানুষের সুখ-দুঃখে তাঁর এই ডিজিটাল লড়াই আরও বহুদূর এগিয়ে যাক, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।

 

সর্বশেষ

নির্বাচিত

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.