Wednesday, October 28, 2026

সর্বশেষ

ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহে বড় শূন্যতা, বিকল্প কতটা প্রস্তুত?

দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন ভোজ্যতেল ব্যবহার হয়। এর বিপরীতে দেশে উৎপাদিত হয় মাত্র ২ লাখ টন। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। চিনির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। দেশের চিনিকলগুলো জাতীয় চাহিদার মাত্র ১ শতাংশের মতো মেটাতে পারে। বাকি চাহিদা পূরণ হয় আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিশোধনের মধ্য দিয়ে।

এই আমদানিনির্ভরতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরেই ভোজ্যতেল ও চিনির বাজার এ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে বড় কোনো আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব সাময়িক বাজার-অস্থিরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; শেষ পর্যন্ত তা ভোক্তাদের কাছেও পৌঁছায়। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিকল্প সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের অনুপস্থিতি সামাল দেওয়ার সুযোগও কম।

আমদানিনির্ভর দুই পণ্যের বাজারে বড় অংশের সরবরাহ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে; এস আলমের অনুপস্থিতিতে ঘাটতি পূরণে চ্যালেঞ্জ বাড়ছে। গত প্রায় দুই দশক ধরে এস আলম গ্রুপ দেশের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। শিল্পগোষ্ঠীটির ছয়টি ভোজ্যতেল শোধনাগার ও দুটি চালু চিনিশোধনাগার রয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছর কারখানাগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আগে তৃতীয় একটি চিনিশোধনাগার নির্মাণাধীন ছিল।

বাংলাদেশে বিক্রি হওয়া প্রতি ১০ বোতল রান্নার তেলের প্রায় ৯টিই আমদানি করা কাঁচামাল থেকে তৈরি। চিনির ক্ষেত্রেও দেশের চাহিদার বড় অংশ আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এস আলম গ্রুপের শোধনাগারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব শুধু একটি শিল্পগোষ্ঠীর ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে দেশের ভোজ্যতেল ও চিনির সামগ্রিক সরবরাহব্যবস্থায়।

বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ভোজ্যতেল খাতে এস আলম গ্রুপের বিনিয়োগ প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার এবং চিনি খাতে প্রায় ৭০ কোটি ডলার। প্রতিষ্ঠানটির দৈনিক সম্মিলিত পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ টন ভোজ্যতেল ও ৫ হাজার ১০০ টন চিনি।

এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, প্রতিষ্ঠানটির শিল্প অবকাঠামো গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়েছে। এমন সক্ষমতার বিকল্প স্বল্প সময়ের মধ্যে তৈরি করা সহজ নয়। কারণ, শুধু কারখানা থাকলেই হয় না; এর সঙ্গে প্রয়োজন সংরক্ষণাগার, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা এবং দীর্ঘদিনে গড়ে ওঠা আমদানি-সম্পর্ক। ফলে এত বড় সক্ষমতা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে বাজারের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে সেই ঘাটতি দ্রুত পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনার সময় দেশের মোট ভোজ্যতেল আমদানির চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশ একাই পূরণ করত এস আলম গ্রুপ। বাংলাদেশ এডিবল অয়েল, টিকে গ্রুপ, সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দেশের শীর্ষ আমদানিকারকদের অন্যতম। এই পাঁচটি শিল্পগোষ্ঠী সম্মিলিতভাবে ভোজ্যতেল ও চিনির মতো পণ্যের মোট আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী।

এস আলমের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এই বিশাল সরবরাহঘাটতি পূরণ করা কঠিন হবে। কারণ, আমদানি সক্ষমতা যখন অল্প কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে, তখন তাদের কোনো একটি বাজার থেকে সরে গেলে ঘাটতি অন্যদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়ে যায় না। বরং এমন একটি শূন্যতা তৈরি হয়, যা বাকি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত পূরণ করতে পারে না।

কর্মসংস্থানেও বড় প্রভাব
ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি রয়েছে কর্মসংস্থান ও জীবিকার প্রশ্ন। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এস আলম গ্রুপের আমদানিনির্ভর শিল্পগুলোতে চিনি ও ভোজ্যতেল কার্যক্রমসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ কাজ করতেন।
প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এই সংখ্যায় কিছুটা ছাড় দিলেও এটি বড় একটি কর্মীবাহিনীর চিত্র তুলে ধরে, যাদের জীবিকা নির্ভর করে কাঁচামাল আমদানি ও সরবরাহের ধারাবাহিকতার ওপর। গত দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে কাঁচামালের চালান আসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁদের কর্মজীবন ও আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়েছে।
এই শ্রমিকদের জন্য সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন কোনো সাধারণ বাজার-পরিসংখ্যান নয়। এটি তাঁদের আয়, পরিবারের ভরণপোষণ এবং জীবিকার ওপর সরাসরি হুমকি। সময়মতো কাঁচামাল দেশে পৌঁছানো ও কারখানার উৎপাদন সচল থাকার ওপরই তাঁদের কর্মসংস্থান অনেকাংশে নির্ভরশীল।

দীর্ঘদিন বড় আমদানিকারককে বাইরে রাখায় ক্ষতিতে সাধারন গ্রাহক
পুরো পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশে, যেখানে ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহব্যবস্থায় বিকল্প সক্ষমতা সীমিত এবং আমদানির বড় অংশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত, সেখানে এত বড় একটি আমদানিকারককে দীর্ঘ সময় বাজারের বাইরে রাখার সুযোগ কতটা?
প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ থাকার প্রভাব শুধু ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেশের ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহের ধারাবাহিকতা, শিল্প অবকাঠামোর ব্যবহার এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান। তাই সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে।

সর্বশেষ

নির্বাচিত

Stay in touch

To be updated with all the latest news, offers and special announcements.